বছর ঘুরে আবারও এল কোরবানির ঈদ। মানুষ কোরবানির পশু বেচাকেনায় ব্যস্ত। প্রতিবছর কোরবানির পর পশুর চামড়া রক্ষণাবেক্ষণ ও বেচাকেনা নিয়ে আপনি পড়েন নানা ঝামেলায়। অথচ কোরবানির আগে ও পরে কিছু বিষয়ের প্রতি যদি লক্ষ রাখেন, তাহলে এই ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়া যায় সহজেই। সেই সঙ্গে বেড়ে যায় আপনার দানকৃত চামড়ার বিক্রির টাকার পরিমাণ। পশু চামড়ার গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে আমাদের দেশে চামড়া ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আট ভাগে চামড়ার মান মূল্যায়ন করে থাকে। ‘এ’ ভাগকে সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে সর্বনি্ন মূল্যায়ন করা হয় এইচ ভাগকে। কীভাবে রক্ষা করবেন আপনার কোরবানির পশুর চামড়ার মান, এবার এ নিয়েই থাকছে কিছু টিপস। আর এসব টিপস দিয়ে সহায়তা করেছেন ল্যান্ডমার্ক ফুটওয়্যার লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন লিটন ও আবু রায়হান শরিফ।

চামড়ার মান রক্ষা
সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে চামড়ার ক্ষতি ও গুণগত মান নষ্ট হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে পশুর চামড়াকে রক্ষা করতে বর্তমান বিশ্বে সাধারণত ড্রাই ট্রিটমেন্ট, সল্ট ট্রিটমেন্ট ও ফ্রিজিং করে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়। উন্নত দেশগুলোতে চামড়া সংরক্ষণে ড্রাই ট্রিটমেন্ট ও ফ্রিজিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও তা ব্যয় ও সময়সাপেক্ষ বলে আমাদের দেশে সল্ট ট্রিটমেন্ট বা লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়। কোরবানির আগে ও পরে কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখলেই অতিসহজে চামড়ার গুণগত মান রক্ষা করতে পারবেন।

কোরবানির আগেঃ অনেকেরই ধারণা, কোরবানির গরুটির গায়ের রঙের ওপরই হয়তো নির্ভর করে এর চামড়ার দাম। আর তাই কালো অথবা লাল গরুটির দাম কিছুটা চড়িয়েই হাঁকেন বিক্রেতা।

* পশু কেনার সময় লক্ষ রাখতে হবে, আগে থেকেই গরুর চামড়ায় কোনো গভীর ক্ষতচিহ্ন বা দাগ যেন না থাকে।

* কোরবানির অনেক আগেভাগেই যদি পশু কিনে থাকেন তাহলে পশুর বাসস্থান হিসেবে এমন কোনো স্থান নির্বাচন করুন যেখানে পশুর গায়ে আঁচড় বা ক্ষত হবে না। পশুর থাকার জায়গায় খড় বা চট বিছিয়ে দিন।

* পশু বাঁধা ও কোরবানির কাজে পাটের রশি ব্যবহার করুন। নাইলন বা প্লাস্টিকের দড়ি, লোহার শিকল পরিহার করুন।

ঈদের দিন সকাল থেকেই পশুকে শক্ত খাবার (খড়, ভুসি, কাঁচা ঘাস ইত্যাদি) দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বেশি করে পরিষ্কার পানি, ভাতের মাড় ইত্যাদি তরল খাবার খাওয়াতে পারেন। এতে কোরবানির পর পশুর চামড়া ছাড়ানো অনেক সহজ হবে।

* পশু কোরবানির স্থান হিসেবে সমতল জায়গা বেছে নিন। এ ক্ষেত্রে এবড়োথেবড়ো রাস্তা ও কংক্রিটের মেঝে পরিহার করুন।

* কোরবানির কাজে অপেক্ষাকৃত দক্ষ লোক ঠিক করতে হবে। আনাড়ি লোক দিয়ে চামড়া ছাড়াতে গেলে চামড়া কেটে যেতে পারে।

* কোরবানির জন্য শোয়ানো অবস্থায় পশুটিকে যেন টানাহেঁচড়া না করা হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

* কোরবানির পশু জবাই করার কাজে বড় ও চামড়া ছাড়ানোর কাজে ধারালো মাথা ভোঁতা ছুরি ব্যবহার করতে হবে।

* কোরবানির কাজে ব্যবহৃত বাঁশ বা লাঠি যেন মসৃণ হয় সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি।

* সঠিক নিয়মে কোরবানির পশু শোয়ানো হলে সাধারণত চামড়া অক্ষত থাকে।

কোরবানির পরেঃ কোরবানির চামড়ার গ্রেডিং ঠিক রাখতে হলে কোরবানির পর চামড়া ছাড়ানোর জন্য কিছু নির্দিষ্ট দিকে লক্ষ রাখা উচিত। এ ছাড়া চামড়া ছাড়ানোর পরে হাতেগোনা কিছু আনুষঙ্গিক কাজ করলে চামড়ার মান অক্ষুন্ন থাকে।

* চামড়া ছাড়ানোর সময় তাড়াহুড়ো করা ঠিক নয়। কোরবানি ও চামড়া ছাড়ানোর কাজ অভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে করুন।

* চামড়া ছাড়ানোর পর দ্রত চামড়ায় লেগে থাকা রক্ত, চর্বি ও মাংসকণা সরিয়ে ফেলতে হবে। কেননা রক্ত-মাংস লেগে থাকা চামড়ায় ব্যাকটেরিয়া দ্রুত আক্রমণ করতে পারে।

* চামড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার সময় টেনেহিঁচড়ে নেবেন না। চামড়া যানবাহনে তোলার সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন।

* চামড়া দ্রুত বিক্রি করতে না চাইলে লবণ দিয়ে চামড়াটি ছড়িয়ে রাখতে হবে।

* সাধারণত চামড়ায় ওজনের ২০ শতাংশ হারে লবণ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি হলে লবণ ব্যবহার করতে হবে তিন থেকে চার কেজি।

* প্রতিবছর কোরবানির আগে ‘বাংলাদেশ লেদার ম্যানুফ্যাকচার অ্যান্ড গুডস অ্যাসোসিয়েশন’ চামড়া কেনার একটি নির্দিষ্ট দাম ঘোষণা করে। সেদিকে লক্ষ রাখলে চামড়া ক্রয়-বিক্রয় করার সময় লোকসান হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়।

* ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া এনে বিক্রি করতে হলে অবশ্যই সল্ট ট্রিটমেন্ট (লবণ ব্যবহার) করে আনতে হবে।

* চামড়াকে পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে নেপথলিন ব্যবহার করা যেতে পারে।

উপরোল্লিখিত টিপস সঠিকভাবে মেনে চললে চামড়ার গুণগত মান যেমন থাকবে, তেমনই প্রত্যাশিতভাবে পাওয়া যাবে চামড়ার দাম। সেই সঙ্গে উন্নত হবে দেশের চামড়া শিল্প। কেননা আমাদের দেশের ট্যানারিগুলো তাদের সারা বছরের প্রয়োজনীয় চামড়ার ৮০ শতাংশ সংগ্রহ করে থাকে কোরবানির ঈদের সময়।

**************************
লেখকঃ আরাফাত সিদ্দিকী
নকশা, দৈনিক প্রথম আলো, ১৮ ডিসেম্বর ২০০৭